মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

মুক্তিযুদ্ধ

লাখাই অঞ্চলে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কোন সম্মুখ যুদ্ধ না হলেও হানাদার বাহিনী লাখাইকে বিভিন্ন সময়ে এসে ব্যাপক হত্যাকান্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায় । কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার বর্ণনা নিম্নে দেয়া হলঃ

লাখাই উপজেলার কৃষ্ণপুর ছিল হিন্দু অধ্যুষিত একটি গ্রাম । ১৯৭১ সনে গ্রামটির যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় আশ পাশের বিভিন্ন গ্রামের শত শত হিন্দু লোক এ গ্রামকে নিরাপদ মনে করে আশ্রয় নেয় । কিন্তু ১৯৭১ সনের অনুমান ১৭ সেপ্টেম্বর (বাংলা ২রা আশ্বিন,-১৩৭৮) অকস্মৎ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং রাজাকার মিলে কৃষ্ণপুর গ্রাম আক্রমন করে । সেদিন ভোর ৫টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত গ্রামে আশ্রয় নেয়া শত শত মানুষের উপর নেমে আসে মহাপ্রলয়। তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার (বর্তমানে কিশোরগঞ্জ) অষ্টগ্রাম থানার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প থেকে একটি স্পিড বোট ও ১০-১২টি দেশীয় নৌকাযোগে শত শত পাকিস্তানী সেনা এবং রাজাকার সম্পূর্ণ গ্রাম ঘিরে ফেলে। এক পর্যায়ে গ্রামের পুরুষ মানুষদের ধরে এনে পিছমোড়া করে বেঁধে লাইন ধরায়। তারপর চলে গুলি। যদুনন্দন রায়ের বাড়ী, গদাইনগর, রক্ষীমনি দাসের বাড়ীতে ২ লাইনে ২৩ জন, গদাইনগর গ্রামে ৩ লাইনে প্রায় ৬০-৭০ জনকে পিছমোড়া করে বেঁধে তারা গুলি করেছিল। অনেক মানুষ কচুরীপানাভর্তি পুকুরে ডুব দিয়ে, কেউবা ধানের জমির আড়ালে আশ্রয় নিয়ে প্রাণ রক্ষা করেছিল। রাত্রিবেলায়  শুরু হয় কান্নার রোল, তীব্র বাতাসে, ঢেউ, বৃষ্টি আর অমাবশ্যার গভীর অন্ধকার ভেদ করে রাত ৩টায় মানুষের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় কৃষ্ণপুর শ্মশানে, শ্মশানের দুইটি চুলায় ৩টি করে লাশ দাহ করতে করতে সকাল হয়ে যায়। হঠাৎ ‘পাঞ্জাবী আসছে’ খবর পেয়ে অনেকে পালিয়ে যায়। কিছু সাহসী মানুষ আবার জড়ো হয়ে বিশাল গর্ত করে ৪৫টি লাশকে একসাথে কবর দেয়। কিছু লাশ পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। সমস্ত গ্রাম শূন্যপূরীতে পরিণত হয়। কৃষ্ণপুর শ্মশান পরিনত হয় গণকবরে। পাক হানাদার বাহিনীর হাতে সেদিন নিহত সেইসব মানুষদের স্মরণে কৃষ্ণপুর হাইস্কুলের সামনে গত ২০০২ সনে উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে নিহতদের নাম সংবলিত একটি সৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।

          পাক হানাদান বাহিনী দ্বিতীয়বার আক্রমন চালায় মুড়াকরি গ্রামে। এ অভিযানে তারা সত্যেন মাষ্টারদের বাড়ীতে আগুন জালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। তৃতীয় অপারেশন চালায় বুল্লা ইউনিয়নের ভবানীপুর ও মাদনা গ্রামে। মাদনাতে দেওয়ান আলীর বাড়ীতে তারা ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়। চতুর্থ অপারেশন চালায় মুড়িয়াউক গ্রামে। ২৯ শে অক্টোবরে কতিপয় রাজাকার বাহিনীর সহায়তায় সুদূর লাখাই ইউনিয়ন থেকে পাক হানাদার বাহিনী মুড়িয়াউক গ্রামে আসে এবং রাতের বেলা কতিপয় দালালের বাড়ীতে আশ্রয় নেয়। খুব ভোর বেলা তারা মুড়িয়াউক গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা জনাব শাহজাহান চিশতির বাড়ীতে চায়। শাহাজান চিশতিকে বাড়ীতে না পেয়ে পাক আর্মিরা তাঁর পিতা জনাব আব্দুল জববারকে(৭০) ধরে নিয়ে যায় এবং তাঁর বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দেয়। একই সময়ে পাক আর্মিরা মুড়িয়াউক গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইলিয়াছ কামালের পিতা-ইদ্রিছ আলী (৬৫)কেও ধরে নিয়ে যায়। উক্ত দুইজন বর্ষীয়ান লোককে তারা লাখাই ইউনিয়নে নিয়ে যায়। পরদিন সেখান থেকে স্পীড  বোট যোগে ভৈরব নেবার পথে গুলি করে হত্যা করে মর্মে জানা যায়। তাঁদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ উপজেলার লাখাই ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা জনাব ইন্দ্র কুমার চক্রবর্তী চুনারুঘাট উপজেলার চা বাগানে পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে মারা যান।